আহমদ শাকির মুহাম্মদ ইসহাক 

বাঙলাদেশ এক স্বাধীন দেশ, লাখো শহিদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জত-সম্ভ্রমের বিনিময়ে একাত্তরে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম, পেয়েছিলাম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল স্বাধীন এক পবিত্র ভূখন্ড।
তবে তিক্ত হলেও বাস্তব সত্য, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও এ দেশের জনগণ স্বাধীনতার স্বাদাস্বদন করতে পারে নি, ধরে রাখতে পারে নি স্বাধীনতার "স"-ও।
এ—আসলেই আমাদের জন্য মহাদূর্ভাগ্যের ব্যাপার, লাখো বাঙালির নিয়তির নির্মম পরিহাস।
আমাদের স্বাধীনতাই আজ পরাধীনতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এ—অদেখা স্বাধীনতা দিয়ে কী হবে?
একজন লেখকের স্বাধীনতা নেই, বক্তার স্বাধীনতা নেই, লেখার জন্য কখনও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা রীতিমত নিষিদ্ধ করে দেয়া হচ্ছে, স্তব্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার মুখ, ভেঙে দেয়া হচ্ছে স্বাধীনতার শতশত কলম, এ যেন কোন মানুষের ওপর নয়, খোদ স্বাধীনতার ওপরই অত্যাার করা হচ্ছে।
সমাজের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই, সাংবাদিকদের স্বাধীনতার কথা, পত্র-পত্রিকার স্বাধীনতার কথা।
যে দেশে খোদ একজন মানুষ স্রেফ ব্যাক্তিগত স্বাধীনতাটাও পাচ্ছে না, সে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা দিয়ে কী করবে।
একাত্তরের সে পাক হানাদার বাহিনীরা আজ অবশ্য নেই, তবে তাদের চেলা-ফেলারা এখনও দেশের পেছনে লেগে আছে।
দেশে গুম, খুন, রাহাজানি, ডাকাতি ও ধর্ষণ ইত্যাদি অবিচ্ছেদ্যাংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, প্রতিদিন অহরহ মা-বোন ধর্ষিতা হচ্ছে, গুম-খুন হচ্ছে নিয়মিত অসংখ্য মানুষ।
এ কেমন স্বাধীনতা দিলে স্রষ্টা!
পাকিস্তানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ-দেশকে এখন বাঙলাদেশ নয়, বাঙলাস্তান বলা-ই যুক্তিসঙ্গত, যুগ দেড়েক আগে খোদ বাংলাদেশের প্রধান প্রথাবিরোধী লেখক ও সাহিত্যক হুমায়ুন আজাদ -ও এ দেশকে বাঙলাস্তান বলে অভিহিত করে গেছেন।

দেশ স্বাধীনে কমবেশি সবারই অংশগ্রহণ ছিল, আলিম-ওলামা, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আবাল বৃদ্ধ সহ সর্বপ্রকার মানুষই শেষতক যোগ দিয়েছিলেন।
ইসলামের ধর্মযাজক বা যাদেরকে আলিম বলা হয়, তারা সহ ইসলাম ধর্মানুসারীরাদের কথানুযায়ী তারা একাত্তরে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য দেশ স্বাধীন করেছিলেন।
দেশের নাস্তিক এবং সংশয়বাদীদের মতে— একাত্তরে তারা বাঙলা স্বাধীন করেছিলেন  গণতন্ত্রের, সমাজতন্ত্রের ও ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন নিয়ে।
 তবে, কেউ যদি স্বাধীনতার সাথে ইসলামকে সম্পৃক্ত করে, অথবা সাম্প্রদায়িকতাকে স্বাধীনতার সাথে জুড়োয়, এ—কি সদার্থবোধক হবে না নির্থক হবে এর কোন উল্লেখযোগ্য কারন দর্শাতে পারব না আমি।
 অবশ্য কেউ যদি জেনে থাকেন, আমাকে জানাবেন।

গণতন্ত্রের, ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন আরও অনেকেরই ছিল, দেশের শিক্ষিত এক বড় অংশের ছিল,তবে প্রকৃত গণতন্ত্রের "গ" প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কিনা তা সবারই অনুমেয় এবং জানা।
গণতন্ত্রের আদলে দেশ না চললেও ক্ষমতাসীন দলের লোকেদের মুখে রীতিমত গণতন্ত্রের বুলি ঠিকই ছিল বা এখনও আছে।
হ্যাঁ, ইসলাম অবশ্য প্রচলিত গণতন্ত্রের পক্ষে না,  আমিও পক্ষে না, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র কোনটাই আমি বিশ্বাসী নই, আমি নাস্তিক বা সংশয়বাদীও নই।
একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী স্রেফ সাধারণ একজন মুসলিম, আমার সাধারণ চিন্তা-চেতনা ও গবেষনার কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।
মানুষ এসবের কিছু করুক বা না করুক, এ—আমি কিছু মনে করি না, দু'টো কথা শেখুক, দু'টো কথা জানুক, এই-ই আমার সাফল্য।

দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় নি বা স্বাধীনতা পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা স্বাধীনতার কথা বলে আমাদের স্বান্তনা দিয়ে পরাধীন করে রেখেছে।
তাই সে কোন গণতন্ত্র, যে গণতন্ত্রে এ-দেশ চলছে, অবশ্য এর এক পর্যালোচনা করবার দরকার, যাতে দেশের ব্যাপারে আমাদের ধরণাটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
আশা করি, সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে এ-ডেমোক্র্যাসি না অটোক্র্যাসি তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।

গণতন্ত্রের সংজ্ঞা
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপায়ে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
আব্রাহাম লিংকন (Abraham Lincoln) 1863 19 november তারিখে তার দেয়া পেনিস্যালভেনিয়া স্টেইটের গেটিসবার্গ বক্তৃতাতে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এভাবে 'Government of the people, by the people, for the people.' যার অর্থ হলো-গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের অংশগ্রহণ, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য। এ সংজ্ঞাটিই গণতন্ত্রের প্রসিদ্ধ সংজ্ঞা এবং ইসলামের সাথে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিকও বটে।
অধ্যাপক গেটেলের মতে,' যে শাসন ব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগে অংশ নেওয়ার অধিকারী তাই গণতন্ত্র।

গণতন্ত্র বলতে কী বোঝায়-
গণতন্ত্র বলতে কোনও জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনও সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায়
যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের
সমান ভোটাধিকার থাকে।